Latest Blog Post

রাষ্ট্রধর্ম বিষয়ে সংবিধান সংশোধন কমিটির সাথে বিশিষ্ট জনদের আলাপচারিতা

সংবিধান সংশোধনে গঠিত সংসদীয় বিশেষ কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত জানিয়েছেন সংসদের নবম অধিবেশনের শুরুতেই সংবিধান সংশোধন সুপারিশমালা নিয়ে প্রতিবেদন তারা সংসদে তুলে ধরবেন ।

আদালতের রায়ে পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ে সুপ্রীম কোর্ট সংবিধান সংশোধনের সুপারিশ করেছিলো, আদালতের রায়ে শুধুমাত্র বিচার বিভাগ পৃথকীকরণের সুপারিশ ছিলো না বরং আরও বিস্তারিত সংশোধনের সুপারিশ তারা করেছিলেন, এ লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটি তাদের আলোচনায় এবং সুপারিশগুলোতে আদালতের নির্দেশনা কতটুকু মেনে চলেছেন তা এখনও বলা কঠিন কিন্তু তড়িঘরি করে ছাপানো সংশোধিত সংবিধানে াদালতের নির্দেশনার পূর্ণ বাস্তবায়ন ঘটে নি। 

নিজেদের ভেতরে পর্যালোচনা শেষে সংসদীয় কমিটি এ বিষয়ে নগরিক সংলাপের আহবান করেন, তাদের সাথে দেশের বিশিষ্ট জনেরা সংবিধানের রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন, প্রথমত তারা আলোচনা করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং প্রাক্তন বিচারপতিদের সাথে, সে সংলাপে প্রাক্তন বিচারপতিগণ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা পদে প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ করবার বিদ্যমান সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুপারিশ করেন, তাদের ভাষ্যে এই বিদ্যমান সিদ্ধান্ত আদালতের উপরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করে। 

তারা সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামের সাংবিধানিক স্বীকৃতিকে নিন্দনীয় বলেছিলেন। ধররনিরপেক্ষ কোনো দেশে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া অন্য সকল ধর্মকে হীন প্রমাণিত করে , তাছাড়া এটার কোনো প্রয়োজনও নেই। 

এই আলোচনার পর সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন  "রাষ্ট্রের কোন ধর্ম নেই। জনগণের ধর্মই রাষ্ট্রের ধর্ম। তাই এ বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা করার কোন মানে হয় না।" 

" সংলাপ করে শুধু মতামত নিলেই হবে না, সবার মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সংবিধান সংশোধন করতে চাইলে অবশ্যই সবার মতামত নেয়া উচিত। সংবিধানের মালিক জনগণ। মতের ক্ষেত্রে ভিন্নতা থাকাটাই স্বাভাবিক। তারপরও সবার মতামত নিয়ে সংবিধান সংশোধন করা অপরিহার্য। এজন্য একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া নির্ধারণ এবং সংবিধান কমিশন গঠন করা যেতে পারে। " 

পরবর্তীতে সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি সম্পাদকদের ডেকেছিলেন, সেখানেও মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং রাষ্ট্রধর্ম প্রসঙ্গেই আলোচনা হয়েছে, অধিকাংশ সাংবাদিক রাষ্ট্রধর্মের বিরোধিতা করলেও দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদক রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে ইসলামকে বহাল রাখবার পরামর্শ প্রদান করেন। 

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক আস্থাহীনতা এবং আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও পরমতসহিষ্ণুতার প্রতি গাঢ় সংশয়জ্ঞাপক তত্ত্বাবধায়ক সরোকার ব্যবস্থার প্রশ্নে অবশ্য সম্পাদকদের অবস্থান অভিন্ন ছিলো, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির পক্ষে সুপারিশ করেছেন, আমরা যে গণতন্ত্রের উপযুক্ত নই এই ধারণা প্রাক্তন সামরিক কর্মকর্তাদের ভেতরে প্রবল থাকলেও এখন দেখা যাচ্ছে ধীরে ধীরে সম্পাদকদের ভেতরেও এই ধারণা সংক্রামিত হয়েছে। 

বিশেষজ্ঞদের আলোচনায় সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নেই, সংবিধানের ৭০ তম অনুচ্ছেদ বিষয়ে সাবধানী মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ, বিশেষ কিছু সংশোধনী সমেত অনেকেই ৭০ অনুচ্ছেদ বজায় রাখবার পক্ষপাতি, সাংসদদের মত প্রকাশের স্বাধীনতা কিংবা দলীয় সিদ্ধান্ত কিংবা দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের মতামত প্রদানের বিষয়ে সীমাবদ্ধতা ৭০ তম অনুচ্ছেদ, বাকস্বাধীনতা, মতের স্বাধীনতার সাথে বিরুদ্ধমত প্রকাশের জন্য শিরচ্ছেদের হুমকি দিয়ে রাখা কোনো অনুচ্ছেদ কিভাবে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে পারে, সে ভাবনা অবশ্য সংসদীয় কমিটির ভেতরেও আছে, তারাও বিশেষ কিছু সংশোধনের পক্ষপাতি। 

সাধারণ মানুষের জন্য এই সংশোধিত সংবিধানে নতুন কি আছে, তাদের নিজস্ব বিশেষ সুবিধা কি নিশ্চিত করবে এই সংবিধান। তারা কি রাষ্ট্রের কাছ থেকে ন্যুনতম মানবিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পাবেন , রাষ্ট্র কি তাদের অন্ন, বস্ত্র বাসস্থান চিকিৎসা সেবার নিশ্চয়তা দিতে পারবে, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে ন্যুনতম সম্মান নিয়ে বেচে থাকাটা তাদের নাগরিক অধিকার এ বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা কি রাষ্ট্র পরিপূর্ণ ভাবে উল্লেখ করবে সংবিধান না কি অস্পষ্ট ভাবে জানাবে রাষ্ট্র বিশ্বাস করে সবারই সম্মানজনক বেঁচে থাকবার অধিকার আছে। 

রাষ্ট্রের ধর্মচিহ্ন নিয়ে সোচ্চার সম্পাদকেরা এ বিষয়ে আলোকপাত করেন নি এটা তেম্ন অবাক করা বিষয় নয়, তারা অনেক বিষয়েই নিজের স্পষ্ট মতামত প্রকাশ করতে আগ্রহী নন। তারা অনেক অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের অবতারণা করতে পারতেন, অহেতুক অপ্রাসঙ্গিক সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারতেন, তারা তা তুলেন নি, তারা সম্পূর্ণ অকারণে শেখ মুজিবর রহমানের প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শনের উপরে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আরোপের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারতেন, কিন্তু তারা তা করেন নি। 

রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম প্রসঙ্গে তাদের অভিমত আমার কাছে গ্রহনযোগ্য মনে হয়েছে, কিন্তু সেটা করতে না পারলেও সংবিধান সংশোধন কমিটি বিকল্প প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারেন, তারা সকল ধর্মকেই রাষ্ট্র ধর্ম ঘোষনার মতো বৈপ্লবিক সিদ্ধান্ত সুপারিশ করতে পারেন, সকল ধর্মের সমান মর্যাদা এবং তাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি একক ভাবে ইসলামের প্রতি বর্তমান আনুগত্যকে দমন করতে সহায়তা করবে। 

আমাদের রাষ্ট্রীয় কার্য নির্বাহ করতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের প্রয়োজন নেই, কিন্তু এ বিষয়ে সাম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার কারণে আওয়ামী লীগ সরকার অন্য অনেক পরিবর্তনের সুপারিশ ধর্ম প্রসঙ্গে কোনো স্পষ্ট অবস্থান গ্রহন করবে না। 

আর কোনো আলোচনার প্রয়োজন নেই, সংসদীয় কমিটির সিদ্ধান্ত সম্ভবত এটাই, তবে সংবিধানে কি কি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে সেটা জানবার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে ২২শে মে পর্যন্ত , সেদিন সংসদ অধিবেশন শুরু হবে।