Latest Blog Post

রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের দর্শন।

১০ বছর আগে হাইকোর্টে বিচারপতি গোলাম রাব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানার বেঞ্চ এক স্ব-প্রণোদিত আদেশে সব ধরনের ফতোয়াকে অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিলেন, সে রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রীম কোর্টে আপীল করেন মুফতি মো. তৈয়ব ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, সুপ্রীম কোর্টে এ রায়ের উপরে শুনানী শুরু হয় এ বছর ১লা মার্চ, 

আজ প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের ৬ বিচারকের বেঞ্চ আজ চুড়ান্ত রায় দিয়েছে , সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত ভাষ্যানুসারে সুপ্রীম কোর্টের অভিমত 

"ধর্মীয় বিষয়ে ফতোয়া দেওয়া যেতে পারে, তবে যথাযথ শিক্ষিত ব্যক্তি তা দিতে পারবে। আর ফতোয়া গ্রহণের বিষয়টি হতে হবে স্বতস্ফূর্ত। এর মাধ্যমে কোনো ধরনের শাস্তি দেওয়া যাবে না। এমন কোনো ফতোয়া দেওয়া যাবে না, যা কারো অধিকার ক্ষুন্ন করে। "

যেকোনো ধর্মীয় বিষয়েই ফতোয়া কিংবা অভিমত প্রদানের দস্তুর থাকলেও বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে "ফতোয়া'র শিকার মূলত সামাজিক ক্ষমতাহীন নারী। নারীর সামাজিক নির্যাতনের বৈধতা প্রদান হয়তো সুপ্রীম কোর্টের চুড়ান্ত লক্ষ্য ছিলো না কিন্তু অতীত উদাহরণগুলো পর্যালোচনা করে কেউ যদি ফতোয়ার ধারাবাহিক বিবর্তন যাচাই করে দেখতো তাহলে সেখানে নারী নির্যাতনের একটি নির্দিষ্ট প্রবনতা তারা লক্ষ্য করতো। 

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এবং সামাজিক বিধি ও অনুশাসন নারী এবং মানবাধিকার বিরোধী, আমাদের সমাজের ভেতরে এভাবেই নারী নির্যাতনের প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়। গত কয়েক মাসের দৈনিক পত্রিকায় নারীর উপর পারিবারিক নির্যাতনের বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এবং বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে নির্যাতিত নারী নিহত হয়েছেন। 

পারিবারিক কলহ, যৌতুক কিংবা যৌন অবিশ্বস্ততার দায়ে এভাবে কাউকে হত্যা করবার বৈধতা রাষ্ট্রীয় আইনে না থাকলেও আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ তাকে বৈধতা দিয়েছে। এমন নিরব নিস্পৃহ সামাজিক স্বীকৃতির কারণে নির্যাতিত নারীদের অধিকাংশই তাদের উপরে নির্যাতনের কোনো প্রতিকার চাইতে পারেন না কিংবা প্রতিকার চাইবার প্রক্রিয়াটিকে সামাজিক ভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়, এমন সামাজিক কাঠামোতে ফতোয়া বিষয়ক ধ্যানধারণার অসহায় শিকার নারী হলেও তার বিরোধিতা করে ১০ বছর আগে হাইকোর্ট যে রায় প্রদান করেছিলো তার বিপরীতে সুপ্রীম কোর্টের প্রদত্ত রায় নিশ্চিত করলো গত এক দশকে আমাদের কোনো সামাজিক অগ্রগতি সাধিত হয় নি। এ রায় আমাদের সামাজিক প্রগতির বিপরীত সংবেদ দিলেও সেটা বর্তমানের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ফতোয়া বিষয়ক অবস্থানকেই পূনব্যক্ত করেছে। 

আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক ভাবে ফতোয়াবিরোধী নয়, তারা সব সময়ই শিক্ষিত এবং উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে ফতোয়া প্রদানের অধিকার সমর্পন করতে আগ্রহী, যদিও ফতোয়া প্রদানকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো নীতিমালা সুপ্রীম কোর্ট কিংবা আওয়ামী লীগ ঘোষণা করে নি।  

দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজের চাওয়া আওয়ামী লীগ ধররনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ধারার উত্তরসুরী হিসেবে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করবে, কিন্তু আওয়ামী লীগ ভোটের রাজনীতিতে এমন ধরমনিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহনে অনাগ্রহী, শুভাকাঙ্খী এবং পরামর্শকদের অগ্রাহ্য করেই তারা ধর্মাবনত রাজনৈতিক মতবাদের চর্চা অব্যহত রেখেছে। 

যারা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করছে তাদের সাথে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচীর প্রধানতম পার্থক্য হলো ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো কোরান ও সুন্নাহভিত্তিক শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে চায়, এ বিষয়ে স্পষ্ট দাবী জানায় এবং সে দাবীর পক্ষে জনমত সংগঠিত করে। আওয়ামী লীগ এ দাবীতে ততটা সরব না হলেও তারা ধর্মকে রাজনীতির অংশ করে তুলেছে , তারা দেশের মানুষের কোমল ধর্মানুভুতিকে আহত না করে বরং এই ধর্মানুভুতিকে তোয়াজ করবার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে দেশের নাগরিককে প্রকৃত ধররনিরপেক্ষতার সংবেদ দেওয়া কিংবা তাদের অভ্যস্ত করে তুলবার রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে অনীহ আওয়ামী লীগ ধর্মকে রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে দিতে আগ্রহী। 

ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে নারী নির্যাতনের পক্ষে নয়, কিন্তু ফতোয়ার মূল শিকার কথিত " যৌন অবিশ্বস্ত নারী" এবং ব্যাভিচারী দুর্বল ও সামাজিক ক্ষমতাহীন পুরুষকে প্রকাশ্য নির্যাতনের স্পষ্ট বিরোধিতাও তারা করতে অনাগ্রহী। তারা সামাজিক কল্যানের নামে এমন সামাজিক নিগ্রহের পক্ষপাতি, তাদের ধারণা এতে বাংলাদেশের ধর্মভীরু নাগরিকদের ধর্মীয় মূল্যবোধের স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে  

আওয়ামী লীগ যদিও নিজেদের কাগুজে ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী কিন্তু তারাও ধারণা করছে বাংলাদেশের মানুষ ধর্মভীরু এবং তারা ধর্মের নামে সামাজিক নির্যাতনের সমর্থক। 

এমন রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক অবস্থান একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার জন্য অপমানজনক। আমি এর প্রতিবাদ করলেও সে প্রতিবাদ ক্ষমতাবানদের কর্ণকূহরে প্রবেশ করবে না। 

উচ্চ আদালত আওয়ামী লীগের ফতোয়া বিষয়ক অবস্থানকে প্রতিষ্ঠিত করে মূলত নিজেদের একই সামাজিক মতের অনুসারী প্রমাণ করলেন। তারাও এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত করলেন যে বাংলাদেশের নাগরিকেরা সামাজিক নিগ্রহন সমর্থন করেন কিংবা তাদের ধারণা এ মতই সামাজিক ভাবে গ্রহনযোগ্য এবং এর বিরোধিতা করা অনুচিত। 

হাইকোর্ট এবং সুপ্রীম কোর্ট গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন স্পষ্ট রায় প্রদান করেছে, তারা তত্ত্বাবধায়ক সরোকার ব্যবস্থাকে অবৈধ ঘোষণা করেছে, যদিও অন্তর্বর্তী কালীন ব্যবস্থা হিসেবে তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই আগামী দুটো নির্বাচন পরিচালনার পক্ষপাতী তবে তারা রায় দিয়েছে প্রাক্তন বিচারপতিদের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত করা যাবে না, এতে হাইকোর্টের উপরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বৃদ্ধি পাবে। 

উচ্চ আদালত মানবাধিকার নিশ্চিত করতে চাইছে, নারীবাদীদের অভিমত যেসব রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা পুরুষতান্ত্রিক সেখানে মানবাধিকার মূলত পুরুষাধিকারের প্রতিষ্ঠা, পুরুষের অধিকার নিশ্চিত করাটাই সেখানে মানবাধিকার নিশ্চিত করবার প্রক্রিয়া বিবেচিত হয়। এবং ফতোয়া বিষয়ক ফতোয়াতে সুপ্রীম কোর্টের ছয় জন বিজ্ঞ বিচারপতি সে আশংকাকেই সত্য প্রমাণিত করলেন। 

সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করা যুগান্তকারী রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের নির্দেশনা প্রদান করলেও সংশোধিত সংবিধান সকল সংশোধনীকে আমলে আনবে না। এ লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি নিজেদের ভেতরে আলোচনা পর্যালোচনা শেষ করে দেশের সুশীল সমাজ ও প্রাক্তন বিচারপতিদের মতামত গ্রহন করেছিলো, সেখানে আমার মতামত প্রদানের অধিকার নেই, এমন কি সাধারণ নাগরিক মতামত যাচাইয়ের কোনো প্রক্রিয়াও তারা গ্রহন করে নি। দেশের সুশীল সমাজ এবং হাইকোর্টের বিচারপতিদের বিজ্ঞ মতামতই সকল সাধারণের মত বিবেচিত হবে কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে বুদ্ধিজীবীগণ সমাজবিচ্ছিন্ন এলিট এবং তাদের সাথে জনগণের সম্পৃক্ততা কিংবা তাদের সাথে জনগণের রাজনৈতিক চেতনার সীমিত পরিচয় বিদ্যমান। তারা প্রকৃতার্থে কি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে পারেন। 

সকল মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা আছে, প্রতিটি মানুষেরই নিজস্ব স্বাধীন মতামত প্রকাশের অধিকার রয়েছে এবং হাইকোর্ট সে অধিকার সমুন্নত রাখবার পক্ষপাতি, কিন্তু রাজনৈ্তিক দলের সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় জনগণের প্রকাশ্য সম্পৃক্ততা না থাকলেও এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা প্রদান করতে অ্নাগ্রহী উচ্চ আদালত। 

যেভাবে উচ্চ আদালত ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক অবস্থানকে পূনর্ব্যক্ত করছে তাতে হাইকোর্টের নির্দেশনার বাইরে গিয়ে যদি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত হয় এবং সেটা যদি কণ্ঠভোটে অনুমোদিত হয় হাইকোর্ট স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কোনো নির্দেশনা কিংবা রায় প্রদান করবে না। 

ফতোয়া বিষয়ক সাফল্যের শেষে পরবর্তী সংবিধান সংশোধনীতেও স্পর্শকাতর ধর্মীয় সংশোধনীগুলো অগ্রাহ্য করা হবে, অধিকাংশ সম্পাদকই রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিপক্ষে মত প্রদান করলেও দৈনিক ইনকিলাবের সম্পাদকের ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম হিসেবে বজায় রাখবার সিদ্ধান্তটিকেই সম্মান করবে আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান তাদের সে সিদ্ধান্ত গ্রহনেই বাধ্য করবে। একই সাথে সাম্ভাব্য জনরোষের ভয়ে তারা সংবিধানের শীর্ষ থেকে বিসমিল্লাহি্র রহমানুর রহিম তুলে নিবেন না।  

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অপরিপক্কতার দায় চুকাবে দেশের ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষেরা, তাদের এভাবে কাগজে কলমে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকত্ব প্রদানের উদ্যোগের বিরুদ্ধে তারা মত প্রকাশ করলে তাদের উপরে নীপিড়ণের মাত্রা বাড়িয়ে দিবে রাষ্ট্র। 

প্রস্তাবিত নারী নীতি বিষয়ে সরকারে সমঝোতামূলক মানসিকতা ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে উৎসাহিত করেছে, তারা ধর্মীয় মূল্যবোধ কিংবা নীতিমালার বিরোধী না হওয়া সত্ত্বেও এই নারী নীতির বিরোধিতা করে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহন করছে, এর বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রচারণা অব্যহত রেখেছে, এবং ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের প্রতিশ্রুত ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের বদলে বাংলাদেশ ক্রমশই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ধর্মনিরপেক্ষ ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।​